ধর্ম

পরিবর্তনশীল সময় ও এক পরম সত্যের গল্প

শাল্লা উপজেলার বুক চিরে বয়ে চলা ছোট্ট একটি নদী দাঁড়াইন, নদীর তীরের হাওয়াটা আজ বেশ হিমশীতল। বিকেলে ঘাটে বসে নদীর বহমান স্রোতের দিকে তাকিয়ে ছিলেন বৃদ্ধ রহিম শেখ। একসময় এই ঘাটেই ভিড়ত তাঁর একের পর এক ধান বোঝাই নৌকা। কিন্তু এক রাতের কালবৈশাখী ঝড় আর পাহাড়ি ঢলে নদীর করাল গ্রাসে বিলীন হয়ে যায় তাঁর বসতভিটা ও এক ফসলি জমির সব স্বপ্ন। রাতারাতি বিত্তশালী রহিম শেখ পরিণত হন এক নিঃস্ব মানবে।
​সম্পদ হারানোর পর গ্রামের প্রভাবশালী লোকজন তাঁকে নিয়ে নানা কটূক্তি করত। অনেকে বলত

—”রহিম শেখের দিন শেষ, যে পতন হয়েছে, তা থেকে আর মাথা তুলে দাঁড়ানো সম্ভব নয়।” কিন্তু রহিম শেখের চেহারায় কোনো হতাশার ছাপ ছিল না। তিনি শুধু মৃদু হেসে বলতেন, “পবিত্র কুরআনের সূরা আলে ইমরানের ২৬ নম্বর আয়েতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট বলেছেন—‘বলুন, হে আল্লাহ! আপনিই রাজ্য ও সার্বভৌমত্বের মালিক। আপনি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান করেন আর যার থেকে ইচ্ছা তা ছিনিয়ে নেন। যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন আর যাকে ইচ্ছা অপদস্থ করেন। আপনারই হাতে রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ।’ মানুষের অহংকার করার কিছুই নেই, কারণ দিন বদলাতে মহান আল্লাহর একটি মুহূর্তই যথেষ্ট।”
​সময়ের আবর্তন বড় অদ্ভুত।

কুরআনের ২৭ নম্বর আয়েতের মতো—যেখানে আল্লাহ বলেন, ‘আপনি রাতকে দিনে এবং দিনকে রাতে প্রবেশ করান। মৃত থেকে জীবিতের আবির্ভাব ঘটান, আবার জীবিত থেকে মৃতের আবির্ভাব ঘটান। আর যাকে ইচ্ছা হিসাব ছাড়া রিজিক দান করেন।’
​কয়েক বছরের ব্যবধানে রহিম শেখের জীবনেও আসে সেই অলৌকিক পরিবর্তন। এক প্রবীণ কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে নদীর তীরের পরিত্যক্ত একখণ্ড অনুর্বর জমিতে আধুনিক উপায়ে সবজি চাষ ও মাছের খামার শুরু করেন রহিম শেখ। যে জমিকে সবাই ‘মৃত’ ও অনাবাদী মনে করত, সেই পোড়া মাটি থেকেই যেন প্রাণের নতুন স্পন্দন জেগে উঠল। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর খামারে অফুরন্ত ফলন আসতে শুরু করে। আবারও ঘুরে দাঁড়ান রহিম শেখ, আল্লাহর অফুরন্ত নিয়ামতে তাঁর সংসার ভরে ওঠে স্বচ্ছলতায়।
​অন্যদিকে, ক্ষমতার দাপটে অন্ধ হয়ে গ্রামের মানুষকে শোষণ করা এবং রহিম শেখকে উপহাস করা এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ক্ষমতার পটপরিবর্তন ও আইনি জটিলতায় পড়ে রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে পড়েন। জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের অন্তরালে তাঁর জীবনে নেমে আসে ঘোর অমানিশা।
​একদিন বিকেলে সেই প্রাক্তন প্রভাবশালী ব্যক্তি নিঃস্ব ও লজ্জিত অবস্থায় রহিম শেখের খামারে এসে দাঁড়ান। রহিম শেখ কোনো ক্ষোভ না রেখে তাঁকে পরম আদরে জড়িয়ে ধরেন এবং খাবারের ব্যবস্থা করে দেন।
​রহিম শেখ তাঁর কাঁধে হাত রেখে বললেন, “ভাই, রাত যত গভীরই হোক না কেন, ভোরের আলো ফুটবেই। আল্লাহ যেমন নিথর মৃত জমিতে প্রাণ ফিরিয়ে আনেন, তেমনি মানুষের জীবনেও রাত-দিনের মতো আলো-ছায়ার খেলা আসে। আমাদের কাজ শুধু সততার সাথে চেষ্টা করা আর তাঁর ওপর ভরসা রাখা।”
​নদীর বাতাসে তখন সন্ধ্যার আজানের ধ্বনি ভেসে আসছিল। রহিম শেখের কথাগুলো ঘাটে বসে থাকা প্রতিটি মানুষের মনে করিয়ে দিচ্ছিল এক চিরন্তন সত্য—ক্ষমতা, সম্পদ আর সম্মান কোনোটাই চিরস্থায়ী নয়; সবকিছুর একচ্ছত্র মালিক একমাত্র মহান সৃষ্টিকর্তা।

হাবিবুর রহমান হাবিব
সাংবাদিক ও কলামিস্ট, শাল্লা (সুনামগঞ্জ)

Related Articles

Back to top button